বাংলাদেশের বিজ্ঞানী বাংলাদেশের সোনালি আঁশ পাটের জিনের রহস্যভেদ করেছেন।
নিউটন প্রশ্ন করেছিলেন নিজের কাছে : আপেল কেন ওপর থেকে নিচে পড়ে? বাংলাদেশের গর্ব জিনবিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম নিজের কাছে প্রশ্ন করেন : রাবার ও পেঁপের জিন বা জীবনরহস্য ভেদ করা গেলে
বাংলাদেশের
সোনালি আঁশ
পাটের জীবননকশা তৈরি করা কেন সম্ভব হবে না? ধানের জিনরহস্য উন্মোচিত করার ফলে উৎপাদন অনেক বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। পাটের ক্ষেত্রে তা হতে সমস্যা কোথায়? একই প্রশ্ন করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজির অধ্যাপক ড. হাসিনা খান। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আরও অনেকে। সর্বাগ্রে নাম করতে হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর। প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা যায় কয়েকটি নাম : তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান ডাটাসফট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট। তারা সবাই তাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন। বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গর্বিত ও যুগান্তকারী ঘোষণায় বাংলাদেশের জনগণ এবং একইসঙ্গে বিশ্ববাসী জেনে গেছেন : সোনালি আঁশ পাটের দেশ বাংলাদেশেই রহস্যভেদ হয়েছে এ প্রাকৃতিক তন্তুর জিনরহস্য। এর ফলে গুণেমানে অনেক উন্নত ও নতুন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পাট উৎপাদন সম্ভব হবে। বাড়বে পাটের বহুমুখী ব্যবহার।
জাতীয় সংসদের ভিআইপি গ্যালারিতে বসে ড. মাকসুদুল আলম, ড. হাসিনা খান ও মাহবুবজামান প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। মাকসুদুল আলম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সমকালকে বলেন, ব্যক্তিগত নয়, বরং দেশের জন্য এটা এক বড় অর্জন। পাটের জন্য শুধু নয়, গোটা অর্থনীতির জন্য এক নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এটা ধরে রাখতে পারলে নতুন সম্ভাবনার যুগে প্রবেশ করবে লাখো শহীদের আত্মদানে আমাদের প্রিয় স্বদেশভূমি। ড. হাসিনা খান বলেন, দারুণ আনন্দ! বাংলাদেশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে, এটা অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইছিলেন না। সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাটাসফটে যে বিশাল এক কর্মী দল নিয়ে কাজ করেছি তাদের প্রায় সবাই বয়সে তরুণ, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। সন্তান বয়সীদের নিয়ে কাজ করার ফল পেয়েছি। এখন তা লাগানো যাবে দেশের কাজে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন তৎকালীন ইপিআর বাহিনীর সদস্য ফরিদপুরের দলিলউদ্দিন আহমদ। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী বাবার সন্তান মাকসুদুল আলম সমৃদ্ধ-গরিয়ান স্বদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন ছাত্রজীবন থেকেই। ঢাকার ল্যাবরেটরি স্কুল ও ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য চলে যান মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। হাসিনা খানের বাবা চেয়েছিলেন, তার মেয়েটি চিকিৎসক হোক। কিন্তু মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেছে নিয়েছিলেন বায়োকেমিস্ট্রি বিষয়। তবে শৈশব থেকেই বাবার আগ্রহ দেখেছেন বাংলাদেশের অনন্য সম্পদ পাটের প্রতি। তাই গবেষণা কাজে বেছে নিয়েছিলেন পাটকে। মাকসুদুল আলম ও হাসিনা খান এমন এক সময়ে পাট নিয়ে মৌলিক গবেষণায় যুক্ত হন, যখন তা নিছকই 'মধুর অতীতের' স্মৃতিচারণ বই কিছু নয়। বিশ্বের বৃহত্তম পাটশিল্প প্রতিষ্ঠান আদমজী জুটমিল লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যসব মিল ক্রমাগত লোকসান দিচ্ছে। শ্রমিকরা চোখে শর্ষে ফুল দেখছে। আর পাটচাষিরা হারিয়ে ফেলছে চাষাবাদে আগ্রহ।
কীভাবে যুক্ত হলেন এ গবেষণায়, সেটা বলছিলেন ড. মাকসুদুল আলম। ডাটাসফট কার্যালয়ে সমকালকে তিনি বলেন, ২০০৮ সালে পেঁপের জিননকশা উন্মোচিত করেছিলাম। সে সময়ে হাওয়াইয়ের প্রধান অর্থকরী ফসল পেঁপের উৎপাদন ছত্রাকের আক্রমণে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এ ক্ষেত্রে তার সাফল্য অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। বিজ্ঞান নতুন সম্পদ সৃষ্টির কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, এটা নতুন খবর নয়। তবে এত দ্রুত মালয়েশিয়া থেকে রাবারের জিনরহস্য ভেদ করার ডাক আসবে, সেটা খানিকটা বিস্ময়েরই ছিল।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়া তার রাবার শিল্প উন্নয়নের জন্য চাইছিল উন্নতজাতের ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাত। কী করে এমন উন্নত জাত উদ্ভাবন করা যায়? জিনবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের কাছে এর উত্তর সহজ : রাবার গাছের জিনের অনুক্রম বা জিনোম জেনে ফেলা। এ ধরনের গাছে প্রায় ২০০ কোটি বেস বা খার জিনোম রয়েছে। এর সম্পূর্ণ অনুক্রম জানা চাই। তাহলেই বলা যাবে, কোন জিনের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি স্বপ্নের রাবার গাছের জন্ম দেবে। সেই চিন্তা থেকেই মালয়েশিয়ার সেইন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় সেন্টার ফর কেমিক্যাল বায়োলজি। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে সেরা বিজ্ঞানীদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসতে হবে, এটাই ছিল লক্ষ্য। পেঁপের জিননকশা উন্মোচনের কারণে মাকসুদুল আলম 'নেচার সাময়িকীর' প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছিলেন। তাকে খুঁজে পেতে মালয়েশিয়া সরকারের তাই বেগ পেতে হয়নি। এভাবেই শুরু হলো মাকসুদুল আলমের সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যুক্ত হওয়ার অধ্যায়।
ড. হাসিনা খান সমকালকে বলেন, মলিকুলার বায়োলজি পড়ায় আগ্রহ গড়ে ওঠে আমার। পাট নিয়ে ভাবতে শুরু করি। আমাদের সোনালি আঁশকে জাদুঘরের দ্রষ্টব্যে পরিণত হতে দেব না, এটাই ছিল সংকল্প। বায়োলজি বিভাগে ছাত্রছাত্রীদের পাট নিয়ে আগ্রহ দেখে আমি বিস্ময়াভূত হই। মাকসুদুল আলম কাজ করছিলেন জিনোম সিকোয়েন্সিং নিয়ে। গ্গ্নোবাল নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশ বায়োটেকনোলজি_ ওয়েববেসড এ সংগঠনের সূত্রে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ৮৬ বছর বয়স্ক বিজ্ঞানী অধ্যাপক আহমদ শামসুল আলম। তারপর ঢাকায় আমরা একসঙ্গে আলোচনায় বসি। যুক্ত হয় ডাটাসফট ও পাট গবেষণা কেন্দ্র। ডাটাসফট আমাদের দেয় তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত পূর্ণ সহযোগিতা।
মাহবুব জামান বলেন, বিপুল পরিমাণ তথ্যপ্রক্রিয়াজত-বিশ্লেষণ করার জন্য এক পর্যায়ে একসঙ্গে এক হাজার কম্পিউটারের সার্ভিস দরকার ছিল। এ কাজে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত একদল বাঙালি তরুণ। আমাদের অর্থনীতি বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে তাদের সেবা কাজে লাগাতে অনেক কিছু করার রয়েছে। তিনি বলেন, ডাটাসফটে তরুণ-তরুণীরা এ প্রকল্পে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছে। এখন পর্যন্ত যে অগ্রগতি হয়েছে তা সম্পন্ন হতে সময় লেগেছে মাত্র ৫ মাস। এটা অবিশ্বাস্য রকমের কম সময়।
কীভাবে কাজ হয়েছে
পাটের জিনরহস্যের দুয়ার খুলে দিতে যে সংগঠনের জন্ম হয় তার নাম দেওয়া হয় স্বপ্নযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ডাটাসফট এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র এ জন্য সমন্বয় রেখে কাজ করে। কৃষিমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে এ উদ্যোগ সম্পর্কে জানালে তারা যথেষ্ট আগ্রহ দেখান। কৃষিমন্ত্রী টেলিফোনে কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক ও গবেষক মাকসুদুল আলমের সঙ্গে এবং তাকে দ্রুত ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানান। গত ডিসেম্বরে তিনি ঢাকা এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক হয় এবং প্রকল্পটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। বাজেট বরাদ্দ করা হয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের তহবিল থেকে। এ গবেষণা কাজে যাতে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়, সেজন্যও সংশ্লিষ্ট সবাই থাকেন সতর্ক।
এ সাফল্য থেকে কী মিলবে?
পাটের জীবনরহস্য ভেদ করার ফলে দেশ কী পাবে, কৃষকের কী লাভ, পাটশিল্প কি ফের সোনালি দিন ফিরে পাবে, এ ধরনের নানা প্রশ্ন ছিল মাকসুদুল আলম ও হাসিনা খানের প্রতি। সমকালকে তারা বলেন, পাট আমাদের নিজস্ব অর্থকরী ফসল। পাটের আঁশ, পাটকাঠি, পাতা কোনো কিছুই ফেল না নয়। জিনরহস্য ভেদ করার ফলে উন্নতজাতের বীজ উদ্ভাবন সম্ভব হবে। পাটের মতোই তন্তুজ হচ্ছে তুলা। পাটের মান উন্নত করার ফলে তুলার সঙ্গে পাটের সংমিশ্রণ করে পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে। এটা সম্ভব হলে পাট চাষে প্রকৃত অর্থেই আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এখন কেবল বর্ষা মৌসুমে পাটের উৎপাদন হয়। এ প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে শীতকালেও পাট উৎপাদন সম্ভব হবে।
হাসিনা খান বলেন, আমরা পাট থেকে কাগজের মণ্ড তৈরি করতে চাই। এজন্য সারা বছর পাটের প্রয়োজন হবে। শীত মৌসুমে পাটের উৎপাদন করার মতো বীজ এখন আমরা উদ্ভাবন করতে পারব। লবণাক্ত সহিষ্ণু ধানের উৎপাদন কৌশল আমাদের দেশ আয়ত্ত করেছে। পাটের ক্ষেত্রেও এটা সম্ভব হবে।
মাকসুদুল আলম বলেন, পাটের পাতার রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ। এ পাতা খাবার জন্য উপকারী। পাতায় কোন উপকরণ বাড়ালে তার ঔষধি গুণ আরও বাড়ানো যাবে, সেটা এখন আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হবে। জিনপ্রযুক্তির সাহায্যে আমাদের দেশ অন্যান্য ঔষধি গাছের উৎপাদন বাড়াতে পারবে। বাংলাদেশে আমের ভালো ফলন হয়। কিন্তু অনেক আমে পোকা ধরে যায়। পেঁপের মতো আমের জিনরহস্য ভেদ করা গেলে সারা বছর আমের উৎপাদন হতে পারে। পোকার আক্রমণ রোধের কৌশলও আমরা জানতে পারব।
মাকসুদুল আলম বলেন, আমাদের এখন উন্নত জাতের পাটের বীজ উৎপাদনের কাজ হাতে নিতে হবে। গবেষণাগারে আমাদের সাফল্য নিশ্চিত হয়েছে। পেটেন্টের কাজ দ্রুত হাতে নিতে হবে। আমাদের কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ এ ধরনের গবেষণায় যুক্ত রয়েছে। তবে তাদের চেয়ে নিশ্চিতভাবেই আমরা এগিয়ে রয়েছি। এ গবেষণার সাফল্য যত দ্রুত মাঠে কৃষকের কাছে নিয়ে যেতে পারব, ততই এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হবে। এজন্য অবকাঠামো সুবিধা চাই। বিজ্ঞানী, তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী, সরকার, শিল্প খাতসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগ চাই। বিজ্ঞানী একটি রূপকল্প তৈরি করেছেন। এখন সৌধ নির্মাণের দায়িত্ব সবার। |