কাহিনীটি একান্তই আলাউদ্দিন আল আজাদের। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের রাজশাহী শাখার সিনিয়র অফিসার দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এ জন্য তাকে বদলি, শোকজসহ নানা শাস্তি দেওয়ার পর চাকরি থেকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া চলছিল। চাকরি সোনার হরিণ। চাকরি বাঁচানোর জন্য তিনি নানাভাবে তদবির করছিলেন। তদবির করতে করতেই পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান তালুকদারের সাক্ষাৎ মেলে। প্রতিমন্ত্রীর হাতে পড়েই বিষয় গুরুতর হয়ে উঠল। ছিল রুমাল, হয়ে গেল বিড়াল। ব্যাংক-বীমাসহ চাকরি ক্ষেত্রে দুর্নীতি-অনিয়ম যেমন বিস্ময়কর ঘটনা নয়, তেমনি এ নিয়ে শোকজ, মামলা, চাকরি হারানোও অলীক ঘটনা নয়। তেমনি চাকরি বাঁচানোর জন্য ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মধ্যে তদবিরও অকল্পনীয় ব্যাপার নয়। অনেক ক্ষেত্রে এতে চাকরি বাঁচে। তদবিরে চাকরি হয়, চাকরি বাড়ে, মৃতপ্রায় চাকরি নতুন জীবনীশক্তি সংগ্রহ করে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তাই চাকরি হারাতে উদ্যত আলাউদ্দিন আল আজাদের হয়ে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এমডিকে প্রতিমন্ত্রীর ফোন করার ঘটনার খবর হয়ে ওঠার ঘটনাটিই বরং বিস্ময়কর ঠেকতে পারে অনেকের কাছে। প্রশ্ন উঠছে, খবর হলো কীভাবে? মুখরোচক এই সংবাদের জন্মদাতা এমডি ও প্রতিমন্ত্রী উভয়েই। খবরে প্রকাশ, মন্ত্রীর ফোন পাওয়ার পর এমডি বলেছিলেন, এই নামে কোনো প্রতিমন্ত্রীকে চেনেন না। আলাউদ্দিন আল আজাদের বরখাস্তের পক্ষে তিনি কিছু যুক্তিও দিয়ে থাকবেন। ফলে বিষয়টি দ্রুত তদবির বা অনুরোধের বিষয় থেকে ব্যক্তিত্বের সংঘাতে পরিণত হয়। হয়তো এমডি হেঁয়ালি করেছিলেন, হয়তো তিনি সত্যিই প্রতিমন্ত্রীকে নামে চিনতেন না। কিন্তু পরিচয় দেওয়ার পর, অসম্মানজনকভাবে তা খোদ মন্ত্রীর কাছেই প্রকাশ করাটা গ্রহণযোগ্য নয়। তেমনি ক্ষেপে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী যে ব্যাংকের এমডিকে তুলে আনার জন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় নিয়োজিত গানম্যান ও অনুসারীদের পাঠিয়েছিলেন সেটিও অগ্রহণযোগ্য। প্রতিমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে গানম্যান পাঠিয়ে একটা যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি করে এমডিকে তুলে আনার ঘটনা ঘটাবেন, এ কেমন কথা! ব্যাংক স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান, পরন্তু গানম্যানও পুলিশি দায়িত্ব পালন করতে পারে না। ফলে বিষয়টিকে স্রেফ হম্বিতম্বি বা মাস্তানি বলেই গণ্য করা চলে। কেউ কেউ বলছেন, প্রতিমন্ত্রীর প্রস্তাব অনৈতিক ছিল। তিনি চাপ প্রয়োগ করে কাজ আদায় করতে চেয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সেটি করতে না পেরে বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেন। এ কথাগুলো হয়তো অসঙ্গত নয়। কিন্তু তারও চেয়ে বড় প্রশ্নটি সামাজিক। আমাদের সমাজের নেতৃস্থানীয় দু'জন ব্যক্তি এভাবে সামান্য কারণে যেভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন এবং যে আচরণ করেছেন তাতে সহিষ্ণুতার কোনো চিহ্ন নেই। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কোনো লক্ষণ মেলেনি। একজন রাজনৈতিক নেতা, প্রতিমন্ত্রী; আরেকজন দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকার হিসেবে কর্মরত, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এমন দুই ব্যক্তির এমন সংঘাতে জড়ানোই অস্বাভাবিক। আর মন্ত্রী যেভাবে ত্বরিতগতিতে গানম্যান পাঠিয়ে নিজের ক্ষমতা দেখানোর পথ বেছে নিলেন তাতে আশঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এক আলাউদ্দিন আল আজাদের কারণে প্রতিমন্ত্রী আজ খবরের বিষয়ে পরিণত হলেন। আমরা আশা করব, মন্ত্রী বনাম এমডি বিবাদ যেন এখানেই শেষ হয়। ব্যাংকের নিয়ম অনুসারে আলাউদ্দিন আল আজাদের চাকরির সুরাহা যাতে হয়। ব্যাংক বা এমডিকে যেন আর নাজেহাল হতে না হয়। কিন্তু এ খবরের শিক্ষণীয় দিকটিও যেন আমরা না ভুলি। সেটি হলো, সহিষ্ণুতা। সহিষ্ণুতা থাকলে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান সহজেই হতে পারে। |